ইসলামের কথা

রহমত,মাগফেরাত ও নাজাতের মাস রমজানের গুরুত্ব ও ফজিলত

রহমত-মাগফেরাত-নাজাতের মাস
রমজানঃ গুরুত্ব ও ফজিলত
মোঃ নাজিম উদ্দিন

প্রথম দশদিনকে ‘রহমত’, দ্বিতীয় দশদিনকে ‘মাগফেরাত’ ও তৃতীয় দশদিনকে ‘নাজাত’ – এ তিন ভাগে অাখ্যা দেয়া পবিত্র মাস ‘রমজানুল মোবারক’ সমগ্র মুসলিম জাতির জন্য এক বিশেষ বার্তা নিয়ে অাসে প্রতিবছর; মহান রাব্বুল অালামিনের
উপহার এ রমজান মাসের গুরুত্ব যেমন অাত্মিক ও ধর্মীয়ভাবে খুবই ফজিলতপূর্ণ, তেমনি রমজানের রয়েছে সামাজিক ও সৌহার্দপূর্ণ শিক্ষন অার বৈজ্ঞানিক স্বীকৃতি।
মানুষের মনোদৈহিক উন্নতিতে, মনস্ত্বাত্তিক উৎকর্ষে রমজানের প্রতিটি দিন যেন এক অত্যুৎকৃষ্ট প্রশিক্ষণ।

ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে রমজানের প্রধান উদ্দেশ্য তাকওয়া বা পরহেজগারি বা অাল্লাহভভীতি অর্জনের প্রশিক্ষণ। মহান অাল্লাহ বলেন, “হে ঈমানদারগণ, তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে। যেমন ফরজ করা হয়েছিলো তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর । যেন তোমরা পরহেযগারী অর্জন করতে পার। ” আল কুরআন। ” সূরা বাকারা, অায়াত ১৮৩।
রমজানে রোজাদার সামনে খাবার দেখেও শুধু অাল্লাহর হুকুম অমান্য না করার ভয়ে থাকেন। রমজানের এ মাসব্যাপী প্রশিক্ষণ বছরের বাকী এগার মাস কাজে লাগিয়ে নিজেদের প্রকৃত মোত্তাক্বী হিসেবে গড়ে তোলে অালোকিত মানুষ সৃষ্টির পথক্রমায় রমজান এক অনন্য ভূমিকা রাখে। তাছাড়া, রোজাদার পরনিন্দা, হিংসা, অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা ইত্যাদি থেকে দূরে থাকে শুধু অাল্লাহর ভয়ে,; সাথে সাথে তার মধ্যে যুক্ত হয় ধৈর্য ও দানশীলতার মত অনুপম গুণাবলী। সুবহানআল্লাহ। নবী করিম (সাঃ) বলেছেন, ‘রোজা ঢালস্বরূপ! তোমাদের কেউ যখন রোজা রাখে, তখন যেন মুখ দিয়ে অশ্লীল ও খারাপ কথা না বলে; কেউ তার সঙ্গে ঝগড়া করলে অথবা গালি দিলে সে যেন বলে—আমি রোজাদার।’ (বুখারি)।
রোজাদারের জন্য রয়েছে অসংখ্য পুরষ্কার। রমজানে এক রাকাত নামাজ বা এক টাকা দান করা বছরের অন্য সময়ের চেয়ে বহুগুণে পুরণ্কার বয়ে অানে। ইফতার, সেহেরি, তারাবিহের নামাজ ইত্যাদি রমজানের বিশেষ উপহার স্বরূপ। ভোর রাতে অতি মর্যাদাসম্পন্ন তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলে মাহে রমজান।

রোজা অামাদের চরিত্র গঠনের এক অনন্য প্রশিক্ষণ। সুবহে সাদেক হতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নিজেদের পানাহার ও নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত রেখে সবর ও সহানুভূতির এক শিক্ষা রমজান অামাদের প্রদান করে। সামাজিকতা, ভ্রাতৃত্ববোধ, পরোপকারিতা, সহমর্মিতা ইত্যাদি স্বর্গীয় গুণ নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করে অনুকরণীয় অাদর্শ সৃষ্টি করে রমজান। ক্ষুধার জ্বালায় অভুক্ত, অনাহারী কীরূপ জটর যাতনা ভোগ করে, তা ধনী-গরীব সকল মুসলমান অনুধাবন করতে পারে। ফলে, ধনী গরীব নির্বিশেষে একে অপরের প্রতি সহানুভূতির সৃষ্টি হয়।
সামাজিক ক্ষেত্রে সম্মান, পারষ্পরিক সহানুভূতি, অার্থিক সহায়তা, যাকাত প্রদান ইত্যাদির ফলে সমাজে অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় থাকে।
তাছাড়া, রমজানের শেষেই ঈদুল ফিতর মানুষে মানুষে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ় করে, যেমন কবি নজরুল বলেছেন,
..”ভুলে যা তোর দোস্ত দুশমন, হাত মেলাও হাতে…”

বৈজ্ঞানিক বিবেচনায় রোজা অামাদের শরীরের জন্য খুবই উপকারী। সারাবছর পানিতে ভরপুর থাকা পুকুরে যেমন বছরে একবার সব পানি ফেলে শুষ্ক করে তলদেশ জীবাণুমুক্ত করা হয়, সারা বছরের জন্য উর্বর, কার্যকর থাকে, তেমনি একমাস রোজা রাখাও মানব শরীরের জন্য এক অতি উত্তম কার্যকর ব্যবস্থা। সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, রোজা মানুষের শরীরের অভ্যন্তর হতে ক্যান্সারের জীবাণু ধ্বংস করে তাছাড়া বহু জটিল রোগ থেকে বাঁচতে রোজা মানব দেহের উপকার সাধন করে।

রমজানের প্রথম দশদিন রহমত, দ্বিতীয় দশদিন মাগফেরাত অার শেষ দশদিন নাজাত – এভাবে বিভক্ত হয়ে মহান অাল্লাহর রহমতের ঢালি নিয়ে অাসে মাহে রমজান। অার শেষ দশদিনের বেজোড় রাতে শবে কদর তালাশ করে সহস্র রাতের এবাদতের সম মর্যাদা অর্জন করার জন্য অাল্লাহ তৌফিক দেন অনেক সৌভাগ্যবানদের।

রমজানের প্রথম সপ্তাহ অতিক্রান্ত। বাকি দিনগুলোতে পরিপূর্ণ প্রশিক্ষণ ও বিশুদ্ধ অন্তরে এবাদত বন্দেগীর মাধ্যমে অাল্লাহর নৈকট্য হাসিল করার সুযোগ দান করুন, অামিন।

(লেখকঃ পেশায় ব্যাংকার
তরুণ লেখক ও সংগঠক)

Close