প্রবাসের কথাসারা বিশ্ব

প্রবাসী শ্রমিক প্রতিদিন দেশে ফিরছেঃ- মুল কারণ নির্যাতন ও প্রতারণা।

রাতুল আহমেদ ফারুক (কাতার)ঃ
আমাদের সুন্দর পৃথিবীর মানুষগুলো বড়ই অদ্ভুত আর আজব।বিশেষ করে কিছু নিম্ন শ্রেণীর মানুষ আছে যাদের মনমানসিকতা এতটাই নিম্নমানের যে তারা যে সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি সেটাই ভুলে যাই।এমন মানুষদের কাছে প্রতিনিয়তই নির্যাতিত এবং প্রতারিত হচ্ছে আমাদের মত হাজার হাজার সাধারন শ্রমিকগন।এটা বেশির ভাগ দেখা যাই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে।প্রতিদিন মধ্য প্রাচ্য থেকে অর্থাৎ কাতার,দুবাই,সৌদি আরব,ইরাক,ইরান সহ কয়েকটি দেশ থেকে ফিরছে শ্রমিকরা।এই ফেরার সংখ্যা আশঙ্কাজনক ভাবে বেড়েই চলছে।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের ইমিগ্রেশন থেকে জানা যায়,প্রতিদিন প্রায় এক থেকে দেড়শ জন শ্রমিক নির্যাতিত এবং প্রতারিতর শিকার হয়ে দেশে ফিরছে।মাঝে মাঝে এই ফিরে আসা নারি ও পুরুষের সংখ্যা আরও বেশি হয়ে যাই।বিষেশ করে বেশি নির্যাতনের শিকার হয় নারী শ্রমিকরা।
২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে সৌদি শ্রমমন্ত্রণালয়ের দেওয়া এক বিবৃতিতে জানানো হয়,সে দেশের নাগরিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে সরকার ১২ টি সেক্টরে ‘সৌদিকরন’ করার ঘোষণা দিয়েছে। এর ফলে গত ১৫ মাসে ৭ লাক্ষেরও অধিক প্রবাসী শ্রমিক সে দেশে ছেড়েছে। সৌদির পরিশংখ্যান দফতরের দেওয়া এক তথ্য অনুযায়ী ২০১৬ সাথে শেষের দিক থেকে ২০১৭ সালের গিয়েছে ৪ লক্ষ ৬০ হাজার।এছাড়া গত ৩ মাসে ২ লাক্ষ ৩০ হাজারের অধিক শ্রমিক শ্রমবাজার ত্যাক করেছে।তবে এর মধ্যে কি পরিমান বাংলাদেশী আছে জানা সম্ভব হয়নি। অনেকের ধারনা মতে বাংলাদেশি সংখ্যা ৩০ হাজারেরও অধিক হতে পারে।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি)-এর দেওয়া এক তথ্যে দেখা যাই,২০১৭-১৮ সালের মধ্যপ্রাচ্যে দেশগুলোতে গমনের হার প্রায় অর্ধেকেরও কম হয়েছে।প্রায় ৮ বছর বন্ধ থাকার পরে যখন ২০১৫ সালে শ্রমবাজার চালু হয়। তখন চালু হওয়ার পর পরই ২০১৬ তে ১ লক্ষ ৪৩ হাজার ৯শ জন শ্রমিক ২০১৭ সালে ৫ লক্ষ ৫১ হাজাত ৩ শ জন শ্রমিক দেশটিতে জীবিকার তাগিদে পাড়ি জমায়। ওবং ২০১৮ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ২ লক্ষ ৬ হাজার ৭শ জন শ্রমিক দেশটিতে যাই। যেটি গত বছরের তুলনায় প্রায় অর্ধেক।
২০০৮ সালে আরব আমিরাতে অর্থাৎ দুবাই সর্বোচ্চ ৪ লক্ষ ১৮ হাজার ২৫০ জন শ্রমিক আরব আমিরাতে গেলেও সর্বশেষ ২০১২ সালে আরব আমিরাতে ২ লক্ষ ১৫ হাজার ৪৫২জন এ নেমে আসে।

আরেকটি মধ্যপ্রাচ্যের ছোট দেশ কোয়েত,এই যুদ্ধবিধ্বস্ত কুয়েত থেকে বাংলাদেশী শ্রমিক দেশে ফিরতে বাধ্য হয় ১৯৯০ সালে।তবে ২০১৪ সালের শেষের দিকে আবার দেশটি বাংলাদেশী শ্রমিক নিতে আগ্রহ প্রকাশ করে তখন থেকে দেশটিতে আবারও বাংলাদেশী শ্রমিকদের কর্মসংস্থান সুযোগ হয়েছে।
তবে ২০১৭ সালে সর্বোচ্চ সংখ্যক শ্রমিক দিয়েছে দেশটিতে।

৫০ হাজারেও বেশি শ্রমিক ফিরছে প্রতিবছর””
বাংলাদেশী শ্রমিক প্রতিবছর কেন ফিরছে অন্যদেশের তুলনায় সেটি জানতে চাইলে অভিবাসন বিশেষজ্ঞ এবং অভিবাসন কর্মী উন্নয়ন কর্মসুচি ওকাপ- এর চেয়্যারম্যান শাকিরুল ইসলাম বলেন,তাদেরকে ফিরতে হচ্ছে বেশ কয়েকটি কারণেই। বিশেষ করে নারী শ্রমিকদের কথা যুদি আমি বলি- তারা নির্যাতনের শিকার হয়ে ফিরছেন।অপরদিকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে আমাদের শ্রমিকেরা Undocumented তথা বেধ অনুমতি ও কাগজ সহ যায়নি।তাদেরকে খুজে বের করে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে।বিশেষ করে সৌদিতে এটা বেশি ঘটছে।ফ্রি ভিসার মাধ্যমে তাদেরকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এখানে গিয়ে তারা কাজ করার অনুমতি পায় না।পুলিশ গ্রেপ্তার করে দেশে পাঠিয়ে দেই।
এই ফ্রি ভিসা কি! এটা সম্পর্কে ব্রাকের মাইগ্রেশন প্রগ্রামের প্রধান শরিফ হাসান হাসান বলেন, আসলে এমন ভিসা নেই।তিনি জানান সাম্প্রতিক সময় প্রায় ৭ হাজার মেয়ে ফেরত এসেছে।২০১৮ সালেই এসেছে দেড় হাজারেও বেশি নারী শ্রমিক।

“এইতো কিছুদিন আগে আমার নিজের সাথে একজন কুমিল্লার নতুন আসা লোকের সাথে কথা হয় খেতে যেয়ে,তিনি বলেনঃ- আমি কাতারে আসছি মাত্র ৩ দিন। দালালের মাধ্যমে আসছি আমাদের কাছে থেকে ৪ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা নিয়েছে। দালালে বলছে অনেক বড় কোম্পানী অনেক কাজ আছে।কিন্তু কাতার আসার পরে দেখি কোন কোম্পানি নেই।আমাকে ছোট একটা রোমে রাতে দিয়ে গেছে এখন পর্যন্ত কেউ দেখা করতে আসে নাই আমার সাথে ৩ দিন হয়ে গেছে। আমি কি করবো বুঝতেছি না।আমাকে খাওয়ার মত কোন টাকা দিয়ে যাই নাই। ফোনের সিমটা পর্যন্ত কিনে দেওয়া হয় নি আমাকে। এখানে শুধু আমি না আমার মত আরও ৪ জন বাংগালী আছে। আমাকে দিয়ে ৫ জন। তাদের মোবাইল দিয়ে কল দিছিলাম তখন বলবো তুমার জন্য কাজ খুজতেছি অথচ তারা আমাকে বলে আনছে যাওয়ার পরের দিনই কাজ দেওয়া হবে। এই কথাটা আমি এখনো বাড়িতে জানায়নি। আমি বিদেশ আসছি জায়গা বিক্রি করে রিন করে। তারপরে তার চোখের পানি ঘরিয়ে পরতে লাগলো””
আমি তখন তাকে কি বলবো খুজে পাচ্ছিল না,তাকে বলার মত ভাষা হারিয়ে ফেলছিলাম।

ফিরে আসা শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ কি?? শরিফুল হাসাম বলেন-যখন দেশ থেকে কেউ বিদেশ যান আমরা তাকে ধার দেওয়ার জন্যও প্রস্তুত থাকি।কিন্তু লোকটি বা নারিটি যখন ফেরত আসে আমরা তাকে সমাজের চোখে অপরাধি বানিয়ে ফেলি বা ব্যর্থ ঘোষণা করি।প্রত্যেকে এমন ভাবে তাকায় যেন সেন অনেক বড় অপরাধ করছে।অথচ এই ফেরত আসায় তার কোন হাত থাকে না।কেউ প্রবাসে যাওয়ার সময় রাষ্ট যে স্বীকৃতি দেই সেটি ফেলত আসার সময় পাই না।

ফেরত আসা লোকদের পুনর্বাসনে বা রাষ্ট্রীয় কোন কাঠামো বা পদ্ধতি নেই

ফেরত আসা লোক যে শুধু ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসবে এমনটা কিন্তু নয়, অনেকে আছে যারা সফল হয়েও ফিরে আসে ১৫-২০ লক্ষ টাকা নিয়ে।সেই টাকা নিয়ে তিনি কি করবেন সে বিষয়ে রাষ্ট্রের কোন কার্যক্রম চোখে পড়ে নি।
ফেরত আসা তথ্যে একই প্রশঙ্গে জানালেন শাকিরুল ইসলাম-রাষ্ট্রীয় ভাবে এখন পর্যন্ত সেরকম কোন পুনর্বাসন প্রকল্প বা উদ্দ্যেক দেখা যাইনি।তবে ওকাপ নিজস্ব উদ্দ্যেগে ফেরত আসা শ্রমিকদের বিশেষ করে নারী শ্রমিক যারা নির্যাতিত ফেরত আসে অর্থাৎ (শারিরীক বা মানুষিকভাবে) চরম বিপর্যস্ত থাকে।তাদেরকে প্রাথমিক আশ্রয় থেকে আইনি সহায়তা দেওয়া হয়।যেসব নারি একেবারেই আবার বাড়ি ফিরতে পারে না,তাদের কর্মসংস্থান এর উদ্দ্যেশ্যে দুটি গার্মেন্টস পরিচালনা করছে সংস্থাটি।

শ্রমবাজার প্রসারিত করতে হবে
বাংলাদেশের শ্রমিকরা সারাপৃথিবী জুরে কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করছে। শ্রমবাজার প্রসারিত করার কোন বিকল্প নেই।গত ৪৭ বছর মধ্যপ্রাচ্যের ৮টি দেশসহ, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, আফ্রিকা,ইউরোপ, আমেরিকা সহ বাংলাদেশের শ্রমবাজার চলছে।বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের এবং সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া এইসব দেশের কোন দেশ মুখ ফিরিয়ে নিলেই শ্রমবাজারে ধস নামে।এক্ষেত্রে বিশেষ করে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করে ইউরোপের বাজারগুলোতে নজর দিতে পরামর্শ দিলে শকিফুল ইসলাম।
মধ্যপ্রাচ্য সহ আরও যে কয়টি দেশের সাথে চুক্তি আছে।ওইসব দেশের সাথে সম্পর্ক আরও জুরালো করতে হবে।এখানে চুক্তিরত দেশগুলোতে অধিক নজরদারি করতে হবে।

রিলেটেড পোস্ট

Close