উপ-সম্পাদকীয়

আজকের ভাবনা: আত্মহত্যা, বৈবাহিক সম্পর্ক ও ইসলাম

আজকের ভাবনা: আত্মহত্যা, বৈবাহিক সম্পর্ক ও ইসলাম:
আলোচনায় ডা: আকাশ

নাজিমউদ্দিন,চট্টগ্রামঃ আজকের “টক অব দা কান্ট্রি” না হলেও “টক অব দা টাউন” সদ্য আত্মহুতি দেয়া তরুণ বিবাহিত ডাক্তার আকাশ। এ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় বেশ অলোচনা ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। স্ত্রীর সাথে মারাত্মক দূরত্ব (ভৌগোলিক ও মনস্তাত্বিক) এ আত্মহত্যার অন্যতম কারণ হিসেবে ধারনা করা হচ্ছে।
এই অমিলের কারণে সর্বোচ্চ যেটা হতে পারত, তা হলো বিচ্ছেদ বা তালাক। কিন্তু কেন এই হীন, ঘৃনিত এই আত্মহত্যা?? এই আত্মহত্যা নিয়ে ইসলাম কি বলে?

“আর তোমরা নিজেদের হত্যা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি দয়ালু। এবং যে কেউ জুলুম করে, অন্যায়ভাবে তা (আত্মহত্যা) করবে, অবশ্যই আমি তাকে অগ্নিদগ্ধ করবো, আল্লাহর পক্ষে তা সহজসাধ্য।” (সূরা আন-নিসা, আয়াত : ২৯-৩০);
আর তোমরা নিজ হাতে নিজদেরকে ধ্বংসে নিক্ষেপ করো না।’ ।
(সূরা আল-বাকারা, আয়াত : ১৯৫)

আত্মহত্যা ও এর কুফল সম্পর্কে ইসলাম এভাবেই সুষ্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়েছে, বহু জায়গায়।
হাদীছে আরো রয়েছে, আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি নিজেকে পাহাড়ের ওপর থেকে নিক্ষেপ করে আত্মহত্যা করবে, সে জাহান্নামে যাবে। সেখানে সর্বদা সে ওইভাবে নিজেকে নিক্ষেপ করতে থাকবে অনন্তকাল ধরে। যে ব্যক্তি বিষপান করে আত্মহত্যা করবে, সে তার বিষ তার হাতে থাকবে। জাহান্নামে সর্বদা সে ওইভাবে নিজেকে বিষ খাইয়ে মারতে থাকবে অনন্তকাল ধরে। যে কোনো ধারালো অস্ত্র দ্বারা আত্মহত্যা করেছে তার কাছে জাহান্নামে সে ধারালো অস্ত্র থাকবে যার দ্বারা সে সর্বদা নিজের পেটকে ফুঁড়তে থাকবে।
(সহীহ বুখারী : ৫৪৪২; মুসলিম : ১০৯)

আত্মহত্যা তো দূরের কথা, শরীয়ত কোনো বিপদে পড়ে বা জীবন যন্ত্রনায় কাতর হয়ে নিজের মৃত্যু কামনা করতে পর্যন্ত বারণ করেছে। যেমন আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমাদের কেউ যেন কোনো বিপদে পতিত হয়ে মৃত্যু কামনা না করে। মৃত্যু যদি তাকে প্রত্যাশা করতেই হয় তবে সে যেন বলে, ‘হে আল্লাহ আমাকে সে অবধি জীবিত রাখুন, যতক্ষণ আমার জীবনটা হয় আমার জন্য কল্যাণকর। আর আমাকে তখনই মৃত্যু দিন যখন মৃত্যুই হয় আমার জন্য শ্রেয়।’ [বুখারী : ৫৬৭১; মুসলিম : ৬৯৯০]

অন্যদিকে,
সুখী জীবন, শরীয়তসম্মত দৈহিক সম্পর্ক ও সুন্দর আগামীর প্রত্যাশায় বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ হয় প্রত্যেকে। আর দাম্পত্য জীবনের সূচনাপর্ব থেকে প্রত্যেকটি কাজী শরীয়ত অনুযায়ী সম্পাদন হওয়াই বাঞ্ছনীয়।
দাম্পত্য যুগলবন্দী হওয়ার পদ্ধতিকে বাংলা পরিভাষায় ‘বিবাহ’ বা ‘বিয়ে’ বলা হয়। আর মহর শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো দান-অনুদান। সোনার তৈরি মুদ্রাবিশেষ বা স্বর্ণমুদ্রাকেও মহর বলা হয়। নামের সিল বা ছাপও মহর নামে পরিচিত।
ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় বিয়ের সময় বরের পক্ষ থেকে কনেকে যে অর্থ বা সম্পদ দেওয়া হয়, তাকে মহর বলে। বিবাহ সম্পাদনের প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘আকদ’। প্রস্তাব, গ্রহণ, সাক্ষী ও মহর হলো ‘আক্দ’ সম্পন্ন হওয়ার মৌল তিন উপকরণ। এর লিখিত রূপ হলো ‘কাবিন’।
‘মহর’ হলো বিয়ের সময় বর কর্তৃক কনেকে প্রদত্ত সম্মানী; যার মাধ্যমে সে স্বামীর অধিকার লাভ করে। মহর নগদে প্রদান করা উচিত। উভয় পক্ষের সম্মতিতে আংশিক বা সম্পূর্ণ বাকিও থাকতে পারে। তবে তা অবশ্যই পরিশোধযোগ্য।

মহর বিয়ের অন্যতম ফরজ। আল্লাহ তাআলা কোরআন মাজিদে বলেন: ‘আর তোমরা নারীদিগকে তাদের মহর স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে প্রদান করবে; সন্তুষ্ট চিত্তে তারা মহরের কিয়দংশ ছেড়ে দিলে তোমরা তা স্বচ্ছন্দে উপভোগ করবে।’
(সুরা: ৪ নিসা, আয়াত: ৪)।
এবার আসা যাক মহরের পরিমাণ নিয়ে। এটি মূলত উভয় পক্ষের সম্মতিতে বরের সামর্থ্য ও কনের যোগ্যতা বিবেচনায় নির্ধারিত হবে। এর সর্বনিম্ন কোনো পরিমাণ নির্ধারিত নেই। কোরআন করিমে বলা হয়েছে: ‘আর যদি তোমরা তাদের কোনো একজনকে অগাধ সম্পদ বা অঢেল অর্থও দিয়ে থাকো, তবু তা হতে কিছুই প্রতিগ্রহণ কোরো না।’ (সুরা: ৪ নিসা, আয়াত: ২০)।

তবে মহরের পরিমাণ এত কম হওয়া উচিত নয়, যাতে মেয়ের সম্মান ও অধিকার ক্ষুণ্ন হয় এবং এত বেশি হওয়াও বাঞ্ছিত নয়, যা ছেলের ওপর জুলুম হয়। মহর পরিশোধের উদ্দেশ্যেই নির্ধারণ করতে হবে, শুধু নামের জন্য নয়।

মহরের অর্থ একান্তই স্ত্রীর। এই অর্থ তিনি যেভাবে খুশি ব্যয় করতে বা সঞ্চয় রাখতে পারবেন অথবা বিনিয়োগ করবেন। তিনি যাকে ইচ্ছা দান-অনুদান বা উপহার ও হাদিয়া হিসেবে দিতে পারবেন। এতে স্বামী বা অন্য কারও কিছু বলার থাকবে না।

আত্মহত্যার আলোচনায় এই মহর বা কাবিনের পরিমাণের অবতারণা কেন হলো, তা সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহে সহজেই অনুমেয়। আধুনিক প্রযুক্তির অপব্যবহার, আকাশ সংস্কৃতির প্রভাব, স্ব স্ব ধর্মীয় অনুশাসন অনুসরণ না করা, পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধার অভাব বা ঘাটতি, পরশ্রীকাতরতা, অন্যের প্রাপ্তির সাথে নিজের অপ্রাপ্তির তুলনা, পরকীয়া প্রভৃতি কারণে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অমিল, বা ক্ষেত্রবিশেষে তা দূরত্বের সৃষ্টি করতে পারে, সহজেই। এর পরিণতি হতে পারে সম্পর্কের বিচ্ছেদ, বা তালাক। কিন্তু প্রচলিত আইনে, যে পক্ষের কারনেই এই বিচ্ছেদ হোক না কেন, স্বামী মহর সহ দাবির অর্থ পরিশোধ করতে বাধ্য থাকে। অন্যদিকে, সমাজের সাম্প্রতিক (অপ)প্রচলনের ফলে “মহর” ধার্য করার সময় বরের আর্থিক সামর্থের চেয়ে কিংবা কনে বা কনে পক্ষের প্রত্যাশার চেয়ে “মানুষ কী বলবে..” এই সামাজিক চাপ বেশী কাজ করে। ফলে একজন স্বামী সারাজীবনে সৎ উপায়ে যা আয় করতে পারে, তার অনেক বেশি পরিমাণ অর্থ মহর হিসেবে ধার্য করা হয়। ফলে, একদিকে যেমন নগদ মহর (sight or cash dowry) এর প্রচলনের চেয়ে সামান্য উসুলের বিপরীতে বিলম্বিত মহর (deferred dowry) এর প্রচলন বেশি হচ্ছে। অন্যদিকে, অধিক পরিমাণ মহরের কারণে দুজনের মধ্যে অস্বাভাবিক অমিল থাকার পরও শান্তিপূর্ন ভাবে বিচ্ছেদ বা তালাকের দিকে যেতে পারে না অনেকে । তাছাড়া, প্রচলিত আইনে বিবাহিত নারীর প্রতি অভিযোগ ততটা আমলে নেয়ার কঠোর কোন বিধান নেই বললেই চলে। আবার, পরকীয়ার সংবাদ বন্ধমহলে সহজে ছড়িয়ে পড়া বা ”ভাইরাল” হওয়া বা ব্যক্তিত্বে আঘাত, সামাজিক ‘স্ট্যাটাস’ প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা ইত্যাদি সবই “আকাশ”দের ঠেলে দিতে পারে অকাল আত্মহুতির দিকে, নীরবে….
আসুন, ধর্মীয় অনুশাসনের মধ্যে থেকে পারস্পরিক শ্রদ্ধার বাঁধনে, প্রকৃত সুখের কাননে পরিপূর্ণ হোক আমাদের জীবন;
নৈতিকতার শিক্ষার প্রসার, লোক-দেখানো কাবিন হ্রাস, ধর্মীয় অনুশাসন মেনেচলা ইত্যাদির মাঝে সমাজে, সংসারে ফিরে আসুক স্বর্গীয় সুষমা।

আসুন, ভেবে দেখি, আমাদের অনেক জীবন অনেক গুরুত্বপূর্ণ; সম্পর্কও। আবেগের ক্ষতিকর বেগের উপচে পড়া প্রভাব যেন আমাদের প্রভাবিত করতে না পারে, ছোট্ট কুঁড়েঘর হয়ে উঠুক ভালোবাসার বাতিঘর।

(নাজিম: চট্টগ্রাম)

[কোরআন-হাদীসসমূহ সংগৃহীত, তাই ভুল থাকলে কমেন্টে জানালে উপকৃত হব)

Close